মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন মুসলিম নেতারা

মুসলিম, নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বে নতুন মাইলফলক গড়েছে ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন।

মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন মুসলিম নেতারা
৫ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম, নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী ও এলজিবিটিকিউ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন এসেছে। বিশেষ করে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি কংগ্রেস ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় জায়গা করে নিয়েছেন মুসলিম, অভিবাসী বংশোদ্ভূত এবং বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনীতিকেরা।

প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল আল-সাইয়েদ

মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল আল-সাইয়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হলেন তিনি।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

৪২ বছর বয়সী আল-সাইয়েদ পেশায় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এর আগে মিশিগানের ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক এবং ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, করপোরেট প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আল-সাইয়েদ। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিও ছিল তাঁর প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনী প্রচারে মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আক্রমণ ও বিতর্কের মুখেও পড়তে হয় তাঁকে।

নিউ জার্সির প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য আদম হামাওয়ি

নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে পরাজিত করে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আদম হামাওয়ি। এর মধ্য দিয়ে নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য হলেন তিনি।

মিসরীয় বংশোদ্ভূত হামাওয়ি একজন প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক সার্জন। সাবেক মার্কিন সেনা চিকিৎসক হিসেবে ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আহত সেনাদের চিকিৎসার পাশাপাশি বসনিয়া, সুদান, লেবানন ও সিরিয়ায় মানবিক চিকিৎসা কার্যক্রমেও অংশ নিয়েছেন। গাজায়ও চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ বাতিল এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেন হামাওয়ি।

রাজ্য সিনেটে মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নারীদের জয়

ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেটে জয় পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম রাজনীতিক নাবিলা সৈয়দ। ২৬তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান ডারবি হিলসকে পরাজিত করেন তিনি। এর আগে ২০২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ইলিনয়ের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন নাবিলা। এবার সিনেটে নির্বাচিত হয়ে অঙ্গরাজ্যের আইন প্রণয়নে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ পেলেন তিনি।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটেও নতুন ইতিহাস গড়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী আবের কাওয়াস। ১২তম ডিস্ট্রিক্টে জয়ী হয়ে নিউইয়র্কের আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি মুসলিম নারী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। কুইন্সের বাসিন্দা কাওয়াস দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। আবাসন, ভাড়াটিয়াদের অধিকার, অভিবাসীদের সুরক্ষা ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জর্জিয়ার আইনসভাতেও জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম রাজনীতিক রুয়া রোমান। এর আগে ২০২২ সালে জর্জিয়ার প্রতিনিধি পরিষদে প্রথম মুসলিম নারী ও প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এবার অঙ্গরাজ্যের সিনেটেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করেছেন।

কংগ্রেসে পুনর্নির্বাচিত মুসলিম আইনপ্রণেতারা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন মুসলিম আইনপ্রণেতা ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সাইমন।

মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ইলহান ওমর। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে রাশিদা তালিবের সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন হন।

মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়েও সরব রয়েছেন তিনি।

ইন্ডিয়ানার সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয় পেয়েছেন আন্দ্রে কারসন। ২০০৮ সালে বিশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসে আসেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কংগ্রেসে নির্বাচিত দ্বিতীয় মুসলিম সদস্য কারসন। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, অভিবাসন, পরিবহন ও কর্মসংস্থান নিয়েও কাজ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন লতিফা সাইমন। নাগরিক অধিকারকর্মী হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিক আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।

নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে প্রথমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার। মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করা এই রাজনীতিক নাগরিক অধিকার ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।

প্রাথমিক ফল ও সংবাদমাধ্যমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে অন্তত সাতজন মুসলিম প্রার্থী মার্কিন কংগ্রেসে জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন সিনেটে এবং ছয়জন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন।

মুসলিমদের বাইরেও একাধিক ঐতিহাসিক অর্জন

২০২৬ সালের নির্বাচনে শুধু মুসলিম প্রতিনিধিত্বই নয়, নারী ও বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অগ্রগতিতেও নতুন নজির তৈরি হয়েছে।

নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট ডেব হাল্যান্ড। রিপাবলিকান গ্রেগ হালকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। লেগুনা পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর সদস্য হাল্যান্ড এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস। তাঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জর্জিয়ার প্রথম নারী গভর্নরও হচ্ছেন আটলান্টার সাবেক এই মেয়র।

ফ্লোরিডার গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস। এর মধ্য দিয়ে কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর হওয়ার নজির গড়েছেন তিনি।

ইলিনয়ের সিনেট নির্বাচনেও নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন ডেমোক্র্যাট জুলিয়ানা স্ট্র্যাটন। রিপাবলিকান ডন ট্রেসিকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ইলিনয় থেকে দ্বিতীয় কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিনেটর হলেন স্ট্র্যাটন।

নিউ হ্যাম্পশায়ারের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান জন ই. সুনুনুকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এর আগে ২০১৮ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে প্রথম প্রকাশ্যে এলজিবিটিকিউ কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন পাপাস।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত অঞ্চল ভার্জিন আইল্যান্ডসে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন স্টেসি প্লাসকেট। তাঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত কোনো অঞ্চলের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস তৈরি হয়েছে।

কয়েকটি নির্বাচনের ফল এখনো চূড়ান্ত নয়

কিছু নির্বাচনে ভোট গণনা ও ফল নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনো চলমান। আলাস্কায় রিপাবলিকান ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট মেরি পেলটোলা। র‍্যাঙ্কড-চয়েস ভোট গণনা পদ্ধতির কারণে এ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল জানতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নির্বাচিত হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দ্বিতীয় আদিবাসী নারী হওয়ার সুযোগ পাবেন।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়া, নতুন প্রজন্মের মুসলিম ও অভিবাসী বংশোদ্ভূত রাজনীতিকদের জয় এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নারী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এসব অর্জন শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও নেতৃত্বের কাঠামোয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ার একটি চিত্রও তুলে ধরেছে।