লালমনিরহাটে তামাক চাষে ছয় বছরের রেকর্ড ভাঙল

দেশজুড়ে
লালমনিরহাটে তামাক চাষে ছয় বছরের রেকর্ড ভাঙল

ছবি: তামাক চাষি অনাথ চন্দ্র (৪৫)

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিষবৃক্ষখ্যাত তামাক চাষে গত ছয় বছরের সব রেকর্ড ভেঙেছে লালমনিরহাট জেলা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় তামাক চাষের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টরে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জমির উর্বরতা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও থামছে না তামাক চাষের আগ্রাসন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, লালমনিরহাট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ হাজার ৫৫০ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪৪০ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ হাজার ৮৬৫ হেক্টর এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে তামাক আবাদ করা হয়। তবে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টরে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

উত্তরের সীমান্তবর্তী এ জেলায় প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। এক সময় এখানে ধান, গম, সরিষা, ভুট্টা, আলু, আখ ও বিভিন্ন শাকসবজির আবাদ ছিল ব্যাপক। কিন্তু টানা লোকসান ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা বিকল্প ফসল হিসেবে তামাক চাষে ঝুঁকছেন। ফলে জেলা সদর থেকে তিস্তা নদী অববাহিকা হয়ে বুড়িমারী স্থলবন্দর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় তামাক চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী এলাকার তামাক চাষি অনাথ চন্দ্র (৪৫) বলেন, “আলু বা সবজি চাষে বড় অঙ্কের খরচ লাগে। তামাক কোম্পানি বিনামূল্যে বীজ ও ঋণ দেয় বলেই তিন বিঘা জমিতে তামাক করেছি। আশা করছি ঋণ পরিশোধের পরও ভালো লাভ থাকবে।”

একই উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ও সারপুকুর এলাকায় তামাক চাষ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় চাষি আবদুল মজিদ জানান, “এলাকায় একাধিক তামাক কোম্পানির কার্যালয় রয়েছে। সব ধরনের সহায়তা পাওয়ায় গত বছর তিন বিঘা জমিতে তামাক চাষ করলেও এবার ছয় বিঘা জমিতে আবাদ করেছি।”

লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন আব্দুল হাকিম বলেন, “তামাক চাষ ও তামাকজাত দ্রব্য সেবন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিড়ি, সিগারেট, জর্দা ও খৈনির কারণে শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক ও ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগ বাড়ছে। তামাক চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারগুলোর মধ্যেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, “তামাক কোম্পানিগুলো যাতে সরাসরি কৃষকদের প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। আমরা কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে সভা-সেমিনার ও উঠান বৈঠক করছি, কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় তারা তামাক চাষেই ঝুঁকছেন।”

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তামাক চাষের এই লাগামহীন বিস্তার অব্যাহত থাকলে জেলার খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে।