৪ কারণে এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

রাজনীতি
৪ কারণে এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন
৫ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, দলের আদর্শ থেকে সরে যাওয়া, রাজনীতিতে নারীর অধিকার উপেক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ঘাটতিকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে প্রকাশিত এক দীর্ঘ বিবৃতিতে দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন সামান্তা। একই সঙ্গে নতুন ধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন বলেন, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো বিবেচনাতেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

তিনি জানান, গত ১১ মাসে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব ও আলোচনার মাধ্যমে এনসিপিকে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়ে সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন। তবে দলের প্রাথমিক মূল্যবোধের প্রতি বর্তমান নেতৃত্ব আর আন্তরিক থাকতে পারবে না—এমন উপলব্ধি থেকেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পদত্যাগের পেছনে চারটি প্রধান কারণ তুলে ধরেছেন তিনি।

জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি

সামান্তা শারমিনের দাবি, এনসিপির রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য সাংবিধানিক, আইনি, রাজনৈতিক ও দলীয় কাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি ছিল।

তবে জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের দলীয় রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রচিন্তার অংশ হিসেবে ধারণ করে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, জামায়াত সংস্কারের কথা বললেও তা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের কৌশলমাত্র।

১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা এবং এ বিষয়ে দলটির ক্ষমা না চাওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন সামান্তা। তাঁর অভিযোগ, অতীতের ভূমিকা নিয়ে দায় স্বীকার না করা দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

সামান্তার মতে, এনসিপি জামায়াতকে সংস্কারের রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে বিবেচনা করায় উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এতে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে দলটি জামায়াতের অবস্থানের অনুসারী হয়ে উঠছে।

নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হাতছাড়া

২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন সামান্তা শারমিন।

তাঁর মতে, ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ ও ১৯৯০ সালের মতো এবারের নির্বাচনও দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারত। কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে সরিয়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সামান্তার দাবি, এনসিপির সামনে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিংবা সংস্কারপন্থি শক্তিগুলোর সঙ্গে বিকল্প রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে যুক্ত না হয়েও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর পাঁচটি বিকল্প পদ্ধতি দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন। তবে সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।

শহীদ ওসমান হাদির নির্বাচনী প্রচারণার উদাহরণ টেনে সামান্তা বলেন, ঢাকার একটি ঝুঁকিপূর্ণ আসনে সীমিত প্রত্যাশা নিয়েও এককভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে বড় দলের সঙ্গে জোট করার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সামান্তা। তাঁর মতে, এ ধরনের যুক্তি অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

নারীর রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষার অভিযোগ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে না পারাকেও পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; তাঁরা আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন এবং আন্দোলনকে সার্বজনীন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তাঁর মতে, নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, সমান অধিকার এবং বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ভিত্তি। ফলে নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির দায়িত্ব ছিল নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা।

কিন্তু দলটি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বরং নারীদের প্রতিবাদ ও মতামত যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন সামান্তা।

তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতা দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে থেকে গেছে।

কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠনে আপত্তি

এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দল প্রত্যাশা করেছিল, যেখানে নেতৃত্ব নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রচলিত দলগুলোর চর্চার বাইরে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এনসিপিতেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, স্বজনপ্রীতি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব এবং ভিন্নমত দমনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সামান্তার ভাষ্য, দলের কাউন্সিল না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পরিপন্থী। এতে নেতৃত্ব নির্বাচনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।

তিনি বলেন, যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে এনসিপির বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ ও সাংগঠনিক চর্চার সঙ্গে একমত হতে না পেরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বিবৃতিতে জানান সামান্তা শারমিন। একই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।