মেয়াদ শেষের ৯২ বছর পরও ঝুঁকিপূর্ণ তিস্তা রেলসেতুতে চলাচল করছে ট্রেন
নির্ধারিত আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৯২ বছর আগে। তবুও লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার সংযোগস্থলে তিস্তা নদীর ওপর অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিক তিস্তা রেলসেতুর ওপর দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন। জরাজীর্ণ কাঠামো ও অস্থায়ী সংস্কারের ওপর ভর করেই সচল রাখা হয়েছে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
১৮৩৪ সালে তৎকালীন নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ২ হাজার ১১০ ফুট দীর্ঘ এই রেলসেতুটি নির্মাণ করে। সেতুটির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ছিল ১০০ বছর। সেই হিসেবে প্রায় ৯২ বছর আগেই এর কার্যকারিতা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্মাণের প্রায় ১৯২ বছর পরও এই সেতু দিয়েই ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
এক সময় এই সেতুটির ওপর দিয়ে রেল ও সড়ক উভয় ধরনের যান চলাচল করত। ১৯৭৮ সালের ৪ মার্চ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেতুটিতে সড়ক সংযোগ উদ্বোধন করেন। দীর্ঘদিন এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিস্তা নদীর ওপর নতুন সড়ক সেতু উদ্বোধনের পর রেলসেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হয়। এরপর থেকে এটি কেবল ট্রেন চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বহু কাঠের স্লিপার পচে নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় নাট-বল্টুর ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইনে ফাটল দেখা দিলে স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে ঝালাই দিয়ে সাময়িকভাবে মেরামত করা হয়। এই অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮টি যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন ঝুঁকি নিয়ে সেতুটি পার হচ্ছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, “এই সেতুটি লালমনিরহাটের রেল যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু বহু আগেই এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সংস্কার কাজ খুব ধীরগতিতে চলছে। দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ ছাড়া নিরাপদ সমাধান নেই।”
৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ ছেয়াদ আলী বলেন, “আমার জন্মের আগেই এই সেতু তৈরি। সারাজীবন দেখে আসছি। ঠিকভাবে সংস্কার করলে হয়তো আরও কিছুদিন চালানো যাবে, কিন্তু ঝুঁকি থেকেই যায়।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী শিপন আলী বলেন, “ভারী ট্রেন চলাচলের সময় কিছুটা ঝাঁকুনি স্বাভাবিক। আমরা নিয়মিত সংস্কার কাজ করি এবং বছরে একবার পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী বর্তমানে সেতুটি ট্রেন চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে সেতুটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন একটি রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।”
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্বাস থাকলেও স্থানীয়দের দাবি—উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রেলসেতু নিয়ে কেবল অস্থায়ী সংস্কার নয়, দ্রুত নতুন রেলসেতু নির্মাণে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। নচেৎ যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

