সরকারি কোষাগারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, অভিযুক্ত ইউপি কর্মকর্তা

দেশজুড়ে
সরকারি কোষাগারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, অভিযুক্ত ইউপি কর্মকর্তা

ভ্যাট-আয়কর ও ট্রেড লাইসেন্সের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ; দুই প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এক ইউপি প্রশাসকের লিখিত অভিযোগ
বরগুনার আমতলীতে এক ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্বের কয়েক লাখ টাকা আত্মসাৎ, ট্রেড লাইসেন্সের অর্থের হিসাব গোপন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন দুই ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসক।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বর্তমানে আমতলী সদর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। তাঁর বিরুদ্ধে আঠারোগাছিয়া, গুলিশাখালী ও আমতলী ইউনিয়ন পরিষদের অর্থনৈতিক লেনদেন ও নথিপত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

এক ইউনিয়নেই ভ্যাট-আয়করের নামে দুই লাখ টাকার বেশি
০৩ নম্বর আঠারোগাছিয়া ও ০১ নম্বর গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রাজিবুল ইসলাম জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগে জানান, জাকির হোসেন আঠারোগাছিয়া ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করের ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেননি। এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স আদায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৯ হাজার ৮৭০ টাকা জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একই অভিযোগে বলা হয়, এর আগে গুলিশাখালী ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৫৭ টাকা এবং হাটবাজার তহবিলের ৮৪ হাজার ৮৯ টাকা সরকারি হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট অর্থের নথিপত্রও সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা অমান্য করেন জাকির হোসেন। এ সময় তাঁর আচরণ নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে।
২০০টির বেশি ট্রেড লাইসেন্স, রেজিস্টারে তথ্য ৯০ জনের
জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ দিয়েছেন ০৬ নম্বর আমতলী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মনজুরুল হক কাওছার। ইউএনও বরাবর দেওয়া অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, জাকির হোসেন দুই শতাধিক ব্যক্তিকে ট্রেড লাইসেন্স দিলেও সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার খাতায় মাত্র ৯০ জনের তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। বাকি লাইসেন্সের বিপরীতে আদায় করা অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের পরিবর্তে ২ নম্বর ওয়ার্ডের এক ইউপি সদস্যের স্বাক্ষর নেওয়া হতো। গত পাঁচ মাসে আদায় করা ট্যাক্সের অর্থও ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়গুলো জানতে চাইলে প্রশাসকের সঙ্গে জাকির হোসেন দুর্ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি তাঁর ৩২ বছরের চাকরিজীবনে ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্সের টাকা ব্যাংকে জমা দেননি এবং এসব কাজ কেবল সচিবের এখতিয়ারভুক্ত বলে দাবি করেছেন-এমন বক্তব্যও অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

একাধিক ইউনিয়নের রাজস্ব নিয়ে প্রশ্ন
দুই অভিযোগপত্রে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আঠারোগাছিয়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন খাতে মোট ৪ লাখ ৯৯ হাজার ১৮৭ টাকা জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে আমতলী ইউনিয়নে ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্সের অর্থ নিয়ে পৃথক অভিযোগ উঠেছে। তবে আমতলী ইউনিয়নের অভিযোগে নির্দিষ্ট আর্থিক অঙ্ক উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সব অভিযোগ মিলিয়ে মোট কত টাকা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

সরকারি রাজস্ব আদায়, ব্যাংকে জমা, রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমে এমন অভিযোগ ওঠায় ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের
অভিযোগের বিষয়ে আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে, অভিযুক্ত মো. জাকির হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সরকারি কোষাগারে কিছু টাকা জমা দিয়েছি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষা। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর ব্যাংক হিসাব, ট্রেড লাইসেন্স রেজিস্টার, ভ্যাট-আয়কর জমার চালান এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকারি কোষাগারে কত টাকা জমা হয়েছে, কত টাকা বকেয়া রয়েছে এবং অভিযোগে উত্থাপিত অর্থের হিসাব কতটা সঠিক-এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তের পর। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী উঠে আসে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়।