ঋতু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যঝুঁকি : শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়

স্বাস্থ্য
ঋতু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যঝুঁকি : শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়
৩ নভেম্বর ২০২৬

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও। এ সময় সর্দি, কাশি, গলাব্যথা ও জ্বরের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

চিকিৎসকদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের সময় শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে অনেকের কয়েক দিন ধরে নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলাব্যথা, শুকনো কাশি কিংবা জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এসব সংক্রমণের বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত এবং সাধারণত নির্দিষ্ট চিকিৎসা ছাড়াই অথবা উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসায় সেরে যায়। তাই প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করে সতর্ক থাকা জরুরি।

যেভাবে ছড়ায় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ মূলত নাক, গলা, শ্বাসনালি ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি কিংবা কথা বলার সময় নির্গত ক্ষুদ্র জলকণা ও বাতাসে ভেসে থাকা জীবাণুর মাধ্যমে এটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এসব জীবাণু শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করলে সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, জ্বর, নাক বন্ধ হওয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সংক্রমণের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার মতো জটিল অসুস্থতাও হতে পারে।

শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশে সংক্রমণ হলে ফ্যারিঞ্জাইটিস ও ল্যারিঞ্জাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দেয়। ফ্যারিঞ্জাইটিসে গলার পেছনের অংশে প্রদাহ হয়। আর ল্যারিঞ্জাইটিসে স্বরযন্ত্র আক্রান্ত হওয়ায় কণ্ঠস্বর ভেঙে যেতে পারে কিংবা স্বর বসে যেতে পারে।

অন্যদিকে, সংক্রমণ শ্বাসনালির নিচের অংশে ছড়িয়ে পড়লে ব্রঙ্কাইটিস হতে পারে। ফুসফুসের বায়ুথলিতে সংক্রমণ পৌঁছালে দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া, যা সময়মতো চিকিৎসা না করালে গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।

সর্দি-জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হলেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের প্রয়োজন নেই। কারণ সাধারণ সর্দি-কাশি ও অধিকাংশ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।

তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে গলাব্যথা বা স্ট্রেপ থ্রোট হতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করতে হয়।

প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা নয়

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়লে নিউমোনিয়া হতে পারে। এ রোগের সাধারণ লক্ষণ হলো জ্বর, কাশি, কফ, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও অতিরিক্ত দুর্বলতা।

নিউমোনিয়া শনাক্ত করতে রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনার পাশাপাশি বুকের এক্স-রে ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়। এক্স-রেতে ফুসফুসের আক্রান্ত অংশে সাদা ছোপ বা ছায়া দেখা যেতে পারে।

সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

রোগ শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

সর্দি, কাশি ও জ্বর বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে দেখা দিতে পারে। তাই শুধু উপসর্গের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট রোগ শনাক্ত করা সব সময় সম্ভব নয়।

রোগীর কাশির ধরন, শ্বাস নিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, জ্বরের স্থায়িত্ব এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।

এ ক্ষেত্রে বুকের এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া শনাক্তের পরীক্ষা করা হতে পারে। প্রয়োজনে বায়োফায়ার প্যানেলের মতো মলিকিউলার পরীক্ষার মাধ্যমে একই সঙ্গে একাধিক রোগজীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব। এতে সংক্রমণের কারণ নির্ধারণ এবং যথাযথ চিকিৎসা বেছে নিতে সুবিধা হয়।

সংক্রমণ এড়াতে যেসব অভ্যাস জরুরি

ঋতু পরিবর্তনের সময় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এ জন্য কয়েকটি বিষয় মেনে চলা যেতে পারে—

  • নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া।

  • হাঁচি-কাশির সময় নাক ও মুখ ঢেকে রাখা।

  • অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।

  • ভিড় ও বদ্ধ জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করা।

  • পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া।

  • শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়া।

  • ধূমপান ও ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশ এড়িয়ে চলা।

  • অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে সতর্ক থাকা।

ফ্লু টিকায় কমতে পারে জটিলতার ঝুঁকি

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু প্রতিরোধে নিয়মিত টিকা নেওয়া উপকারী হতে পারে।

শিশু, প্রবীণ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, সিওপিডি রোগী এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফ্লু টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই টিকা ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি সংক্রমণ হলেও রোগের তীব্রতা ও গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা কমাতে সহায়তা করে।

সব মিলিয়ে, ঋতু পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশি ও জ্বরকে সাধারণ সমস্যা মনে করে অবহেলা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রয়োজনীয় টিকাদানের মাধ্যমে এ সময় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।