দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে গুজরাটের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ২০ শতকের দুই প্রভাবশালী নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ—দুজনেই গুজরাটের সন্তান। এক সময়ের এই প্রদেশ এখন ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে।
বর্তমান ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির দুই প্রধান স্তম্ভ—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, দুজনেই গুজরাট থেকে উঠে এসেছেন। মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালেই ‘গুজরাট মডেল’ নামক উন্নয়ন দর্শন তুলে ধরেন, যা ২০১৪ সালে তার জাতীয় নির্বাচনী প্রচারের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়।
শুধু রাজনীতি নয়, ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক শক্তিও গুজরাটের হাতে। মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানি—এই দুই শিল্পপতি দেশের টেলিকম, জ্বালানি, বন্দর, বিমানবন্দরসহ বহু খাতে প্রভাব বিস্তার করছেন। মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় আদানির ব্যক্তিগত বিমানে দিল্লি যাত্রা সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেই মনে করেন অনেকে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চতায় পৌঁছালেও, বহু বিশ্লেষক মনে করেন গুজরাটিরা ভারতের সাংস্কৃতিক বুদ্ধিজীবী মহলে ততটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। স্বাধীনতার পর ভারতের জাতীয় পরিচয় গঠনে এগিয়ে ছিল ইংরেজিভাষী, বাঙালি ও দক্ষিণ ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা। গুজরাটিরা তখনও মূলত ব্যবসা ও অভিবাসনেই মনোযোগী ছিলেন।
গুজরাটের বহুজাতিক চরিত্র একসময় রাজ্যের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু এখন সেই বৈচিত্র্য অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ছায়া এখনও রয়ে গেছে। আজকের আহমেদাবাদ হয়ে উঠেছে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত একটি শহর। খাদ্যাভ্যাস নিয়েও চলছে আগ্রাসী আচরণ; নিরামিষভোজীদের আধিপত্য বাড়ছে, ডেলিভারি কর্মীদের ওপর পর্যন্ত প্রভাব পড়ছে।
গুজরাটের ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলমান হলেও, ১৯৮৯ সালের পর থেকে রাজ্য থেকে কেউই সংসদে নির্বাচিত হননি। বিজেপি টানা ২৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে রাজ্যটিতে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে গুজরাটের প্রভাব যতই বেড়েছে, ততই কমে এসেছে ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য।
মোদী এখন প্রায় সেই সময়কাল জুড়ে ভারতের শাসনভার নিয়েছেন, যতদিন তিনি গুজরাট চালিয়েছেন। তার শাসন ব্যবস্থায় দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং আয় বৃদ্ধি—তবে সেই সঙ্গে বেড়েছে ধর্মীয় উত্তেজনা, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে ভারত একদিন ছিল সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের প্রতীক, আজ তা ক্রমেই গুজরাটের মতো হয়ে উঠছে—যেখানে উন্নয়ন আর জাতীয়তাবাদের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে বহুত্ববাদ, মুক্ত চিন্তা এবং সামাজিক সংহতির ঐতিহ্য।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

