শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
Logo

কুষ্টিয়ায় বালুর সাম্রাজ্য: দুইশ কোটি টাকার বালু যাচ্ছে কার পকেটে?

ডেস্ক রিপোর্ট।।

পদ্মা ও গড়াই নদীর বুকে জমে উঠেছে এক বিশাল বালুবাণিজ্য। জেলার ২১টি বালুমহাল থেকে প্রতিবছর তোলা হচ্ছে অন্তত দুইশ কোটি টাকার বালু, অথচ সরকারের রাজস্ব আয় মাত্র দুই কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি আর পরিবেশ ধ্বংসের দায় কার—উত্তর নেই কর্তৃপক্ষের কাছেও।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মা ও গড়াই নদীর তীরঘেঁষে চলছে প্রকাশ্য বালু উত্তোলন। কোনো অনুমোদন ছাড়াই নদীর মাঝখানে ড্রেজার বসিয়ে চলছে বালু তোলার উৎসব। নদীর দুইপাশে ঘাটগুলো পাহারা দিচ্ছে অস্ত্রধারী সশস্ত্র গ্রুপ, যেন রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট।

বালু তোলার প্রভাব গিয়ে পড়েছে ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজের উপরেও। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান বলেন, “ফাউন্ডেশনের নিচ থেকে বালু তুলে ফেলায় নদীতে গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে, যা ব্রিজের পিলারের জন্য সরাসরি হুমকি।”

জেলার ২১টি বালুমহালের মধ্যে মাত্র ২টি সরকারি ইজারা পেয়েছে। নাব্যতা, পরিবেশগত ঝুঁকি ও আইনি জটিলতায় বাকি ১৯টি থেকে উত্তোলন নিষিদ্ধ। তারপরও সেগুলো থেকেই বালু তোলা হচ্ছে প্রকাশ্যে—প্রশাসন দেখেও দেখছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ মহল। যুবদল, বিএনপি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নাম উঠে এসেছে একাধিক ঘাট নিয়ন্ত্রণে। ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করলে এক নেতা বলেন, “বালু পেতে হলে পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মনোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”

মনোয়ার হোসেন নিজেও স্বীকার করেন, “দাম ১৮০০ মতো, আপনি বললে একটু কমে দেব।” অন্যদিকে সাবেক চেয়ারম্যান জানবার হোসেনসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে আসে ঘাট দখলদারিত্বে।

জেলা বিএনপির নেতারা আবার বিষয়টি অস্বীকার করেন। আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন বলেন, “আমরা বাধা দেই বলেই এখন আমাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ আসছে।”

কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, “অবৈধ উত্তোলনে সরকারের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ফায়ারিং প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হয়।”

জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, “চুরি হলে সেটা চুরি। তবে আমরা আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা করছি।”

তবে বাস্তবতা হলো, রাতের আঁধারে চলে বালু তোলার মহোৎসব, প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়েই ট্রাকভর্তি বালু ছুটে চলে জেলার বাইরের গন্তব্যে।

স্থানীয়রা একে বলেন ‘এল ডোরাডো’—এক রহস্যময় সোনার খনি। সচেতন নাগরিক মিজানুর রহমান লাকীর ভাষায়, “এই বালু মানে স্বর্ণ। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, বালুর ঘাট তাদের ছায়াতলে চলে যায়। এখানে ডিসিরাও বদলি হতে চান না—কারণটা বোঝাই যাচ্ছে।”

প্রতিদিন শুধু একটি ঘাট থেকেই তিন ধরনের বালু বিক্রি করে আয় হচ্ছে প্রায় ৫.৫ লাখ টাকা। বর্ষা, খরা কোনো মৌসুমেই বন্ধ হয় না এই অবৈধ লেনদেন।

এই দুর্বৃত্তায়নের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া, প্রশাসনিক নীরবতা, আর দুর্বল নীতিমালা। কুষ্টিয়ার নদীগুলোর বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে শুধু বালু নয়—সরকারি রাজস্বের অপচয়, পরিবেশের ক্ষতি, আর ভবিষ্যতের হুমকি।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন