শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
Logo

প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরে জলবায়ু অর্থায়ন, প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগে গুরুত্ব

নিউজ ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন তুরস্ক সফরে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ-৩১)-এর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবেন তিনি।

সফরে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরার পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঢাকা ও আঙ্কারার কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের দাবি তুলে ধরবে ঢাকা।

তুরস্কের আনতালিয়া এক্সপো সেন্টারে ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে কপ-৩১। সম্মেলনের ১১ ও ১২ নভেম্বর বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ১০ নভেম্বর ঢাকা ছাড়বেন। সফর শেষে ১২ নভেম্বর দেশে ফেরার উদ্দেশে রওনা দেবেন।

জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণে জোর

কপ-৩১ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো যাতে নতুন করে ঋণের বোঝায় না পড়ে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সায়মুম পারভেজ জানিয়েছেন, সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার জন্য গঠিত লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের অর্থ বাড়ানোর দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যাতে সহজে এই তহবিল থেকে অর্থ পায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ দাবিগুলো অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে তুলে ধরবে বাংলাদেশ।

বন ও পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ছে। এই আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা চাইবে ঢাকা।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত সফরে তুরস্কে গিয়ে বিশ্বনেতাদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবেন। বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলন শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আয়োজন নয়; বরং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় দেশের স্বার্থ, অর্থায়নের দাবি এবং উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়গুলো তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ।

তিনি আরও জানান, সম্মেলনে জলবায়ু সহনশীলতা ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অর্জন তুলে ধরার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতি উন্নত বিশ্বের দায়িত্ব পালনের দাবি জানানো হবে।

তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সম্প্রসারণ

জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তুরস্কের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে আরও বিস্তৃত অংশীদারত্বে যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এরদোয়ান। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ওই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় আনতালিয়া সফরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কপ-৩১ সম্মেলনে অংশগ্রহণ, উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নবায়নযোগ্য ও সবুজ জ্বালানি এবং বাংলাদেশে তুরস্কের বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া ২০২৭ সালের শুরুতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্মেলনে তুরস্ককে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান হুমায়ুন কবির।

এর আগে ২৭ আগস্ট সৌদি আরবের জেদ্দায় ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুলাকলিকায়ার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের বিষয়টি আলোচনায় আসে। দুই পক্ষ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করে।

এ ছাড়া গত ৬ জুন ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ওই সফরে দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পাশাপাশি নিয়মিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা, সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে এসব সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরে জলবায়ু অর্থায়নের দাবি আদায়ের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে থাকবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন