বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী চীন। দেশটির অবস্থান হলো, কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে আছে নাকি বিরোধী দলে—তার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব নির্ধারণ করে না বেইজিং। রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় দেশটি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোনো দল ক্ষমতায় রয়েছে, নাকি ক্ষমতার বাইরে—এটি চীনের কাছে বন্ধুত্বের মাপকাঠি নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক বিভাজন তৈরির কোনো আগ্রহও বেইজিংয়ের নেই।
লিউ হাইশিং বলেন, ঐতিহাসিক আস্থা, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। গত পাঁচ দশকে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতায় নির্মিত মহাসড়ক, সেতু ও টানেল অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে মোংলা বন্দর শিল্পপার্ক এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন চীনা মন্ত্রী। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে উন্নতমানের পণ্য আমদানি বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাম্প্রতিক পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের প্রসঙ্গ টেনে লিউ বলেন, দল পরিচালনা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিনিময়ে প্রস্তুত চীন। সরকার পর্যায়ের যোগাযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, তরুণ নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যেও সম্পর্ক বাড়াতে চায় দেশটি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজের উদ্বোধন করা হয়। দুই দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে কেন্দ্রটি কাজ করবে বলে জানান লিউ হাইশিং।
বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াতের বক্তব্য
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে পরিচালিত। বাংলাদেশ স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। রিজভী বলেন, উৎপাদন, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, বস্ত্র, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ওষুধশিল্পে চীনা বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানির ৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগে প্রস্তাবিত চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা এবং দেশে একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় চীনের সহযোগিতা চান রিজভী। এক চীন নীতির প্রতি বিএনপির সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তিনি চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, সহযোগিতা ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। নতুন উদ্বোধন করা কেন্দ্রটিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চীনের মতবিনিময়ের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
এ ছাড়া তরুণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য সফর, যৌথ অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাড়ানোর আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চল সংকটের মুখে রয়েছে। তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

