যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়েছেন তিনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও নির্বাচনী পূর্বাভাসকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণে তার জয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থী। খবর রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের।
নির্বাচনী ফলাফলের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আল-সাইয়েদ প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে রজার্সের প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৪৬ শতাংশ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনটি দলটির দখলেই থাকছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ৪২ বছর বয়সী আল-সাইয়েদ নির্বাচনী প্রচারণায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং রাজনীতিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে প্রচারণার সময় তার মুসলিম পরিচয়, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। এসব বিষয় সামনে এনে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে তাকে বিভিন্নভাবে আক্রমণও করা হয়।
ডেমোক্র্যাট শিবিরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ
নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট শিবিরেও বিভক্তি দেখা দেয়। দলীয় প্রাইমারিতে আল-সাইয়েদের কাছে পরাজিত হওয়া মিশিগানের প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেনস নির্বাচনের কয়েক দিন আগে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান।
তার এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাট নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। দলটির কয়েকজন নেতা স্টিভেনসের অবস্থানের সমালোচনা করেন। এমনকি তার কয়েকজন কর্মীও পদত্যাগ করেন।
স্টিভেনস দাবি করেন, আল-সাইয়েদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং অনলাইন রাজনৈতিক ভাষ্যকার হাসান পাইকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্যদিকে, স্টিভেনসের সমর্থন ঘোষণাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি আল-সাইয়েদ। বরং ওই ঘোষণার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার নির্বাচনী তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনুদান জমা পড়ে বলে জানান তিনি।
মুসলিম পরিচয় নিয়ে ট্রাম্পের আক্রমণ
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মিশিগানে প্রচারণা চালান। এ সময় ট্রাম্প আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন।
এ ছাড়া তাকে উগ্রপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন আল-সাইয়েদ।
ট্রাম্প এক পর্যায়ে আল-সাইয়েদকে ‘মোহাম্মদ’ নামে সম্বোধন করেন। এর জবাবে আল-সাইয়েদ বলেন, ট্রাম্প তার নাম কীভাবে উচ্চারণ করছেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। নির্বাচনের পর ট্রাম্প তাকে ‘সিনেটর’ বলেই সম্বোধন করবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওবামা ও কমলা হ্যারিসের সমর্থন
নির্বাচনী লড়াইয়ে আল-সাইয়েদ ডেমোক্র্যাট দলের প্রভাবশালী নেতাদের সমর্থন পেয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা তার পক্ষে অবস্থান নেন।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপেও প্রতিদ্বন্দ্বী রজার্সের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন আল-সাইয়েদ। তবে দলীয় প্রাইমারি ও সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় তাকে নানা অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
মিশিগানে জন্ম, মার্কিন সিনেটে নতুন ইতিহাস
মিশিগান অঙ্গরাজ্যে মিসরীয় অভিবাসী বাবা-মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল আল-সাইয়েদ। চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ডেট্রয়েট ও ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
এর আগে ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয়ী হতে পারেননি তিনি।
এবার সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করলেন আল-সাইয়েদ। তার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম মার্কিন সিনেটের সদস্য হতে যাচ্ছেন।

