মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Logo

কমতি নেই জোগানে, ‘আয়ের অর্ধেক ব্যয়ই’ খাবারের পেছনে

ডেস্ক রিপোর্ট।।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রথমবারের মতো ৫ কোটি টন ছাড়িয়েছে, যা একটি বড় অর্জন। তবে একই সময়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি, নিরাপদ খাদ্যের ঘাটতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস—এই সব কিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১৯ লাখ টন, গম ১০ লাখ টন এবং ভুট্টা ৭৪ লাখ টন। মোট দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩ লাখ টনে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩.২৯ শতাংশ বেশি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এখন সরকারি গুদামে ১৫ লাখ ৬৭ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে—বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে চাল ১৫ লাখ ৯ হাজার টন, ধান ৪ হাজার টন এবং গম ৫৪ হাজার টন।

খাদ্য সচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন,

“উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংগ্রহ ও সরকারি ক্রয়মূল্যের সমন্বয়ের কারণেই রেকর্ড মজুত সম্ভব হয়েছে।”

সরকার ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৫ লাখ টন চাল ও ৪ লাখ টন গম আমদানির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

সামাজিক খাদ্য কর্মসূচি জোরালো হলেও ব্যয় বাড়ছে পরিবারগুলোর

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকার খাদ্যবান্ধব কার্যক্রম (এফএফপি), ওএমএস এবং ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১ কোটির বেশি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে।

বর্তমানে ১,৯০২টি ওএমএস কেন্দ্রে প্রতি মাসে ৫ কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫৫ লাখ পরিবার মাসে ৩০ কেজি চাল পাচ্ছে। এছাড়া চা শ্রমিকদের গম দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১৯ টাকায়।

তবু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণা বলছে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অর্ধেক বা তার বেশি খাবার কেনায় ব্যয় করছে।
প্রতি ১০টি পরিবারের একটি খাবারে ব্যয় করছে আয়ের তিন-চতুর্থাংশের বেশি।

মূল্যস্ফীতি ও আয়ের বৈষম্যে খাদ্য ঝুঁকি

সেপ্টেম্বর ২০২৫ মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৬৪ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে আয় ও ব্যয়ের বৈষম্য আরও বেড়েছে।

অধ্যাপক সেলিম রায়হান (সানেম) বলেন,

“উৎপাদনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, যা পুষ্টি গ্রহণে বাধা দিচ্ছে।”

 ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ এখনো সুষম খাদ্য পায় না

উৎপাদন বাড়লেও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের নিশ্চয়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতিসংঘের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় বিশ্বের চতুর্থ স্থানে, যেখানে ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA)-এর তথ্য অনুযায়ী:

২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংগ্রহকৃত ১,৩৮১টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ১৫% অনিরাপদ।

২০১৯-২০ সালে এই হার ছিল ১১%।

ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফ নামক একটি এনজিওর হিসাবে, দেশে ৪০% খাদ্যে ভেজাল রয়েছে, যা ৩৩% বয়স্ক ও ৪০% শিশুর অসুস্থতার কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের ড. খোরশেদ বলেন,

“খাদ্য নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়—উৎপাদক, বিক্রেতা ও ভোক্তাকেও সচেতন হতে হবে।”

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন