বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Logo

দিল্লি পুলিশের চিঠিতে বাংলা ভাষাকে বলা হলো বাংলাদেশি ভাষা

ডেস্ক রিপোর্ট।।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আটকদের নথিপত্রে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ উল্লেখ করে অনুবাদক চাওয়ায় উত্তাল হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মহল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ-প্রতিবাদ ও ভাষা রক্ষার ডাক।

দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনের অফিসার ইনচার্জকে পাঠানো একটি সরকারি চিঠিতে বলা হয়, লোধি কলোনিতে আটককৃত আটজন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত ডকুমেন্টসমূহ ‘বাংলাদেশি ভাষায়’ লেখা, এবং সেগুলোর অনুবাদের জন্য একজন দক্ষ অনুবাদক প্রয়োজন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক টুইটে লেখেন:

“বাংলা কেবল একটি ভাষা নয়, এটি আবেগ, সংস্কৃতি ও ভারতের অন্যতম স্বীকৃত সাংবিধানিক ভাষা। তাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে চিহ্নিত করা অপমানজনক এবং অসাংবিধানিক। কেন্দ্রের এই মনোভাব বাঙালিদের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।”

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে ‘নতুন ভাষা আন্দোলন’ শুরু করা হবে।

ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদার বলেন:

“এই চিঠি বিজেপি সরকারের মনের প্রতিচ্ছবি। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এই মনোভাব আমরা কখনোই বরদাশত করবো না।”

সিপিআইএম নেতা মোহাম্মদ সেলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

“বাংলা ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। রাষ্ট্রীয় সংগীত, জাতীয় গান—সবই বাংলায়। সেই ভাষাকে ‘বিদেশি’ আখ্যা দেওয়া অজ্ঞতা নয়, এটি সাংবিধানিক অবমাননা।”

গায়ক রূপম ইসলাম, কবি সুবোধ সরকারসহ অনেকে এই মন্তব্যকে ‘অশিক্ষিত ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা লেখেন:

“বাংলা ভাষা ভারতের আত্মার অংশ। একে বাংলাদেশি ভাষা বলা মানে নিজের ইতিহাস অস্বীকার করা।”

তবে এই অভিযোগে পাত্তা না দিয়ে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন:

“বাংলাদেশের বাংলা ও ভারতের বাংলা এক নয়। শৈলী, বানান, শব্দচয়ন—সবই আলাদা। পুলিশের ভাষা বিভ্রান্তিকর হলেও উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত উৎস চিহ্নিত করা।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশি কোনো নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে থাকলে তা শনাক্ত করাই স্বাভাবিক। ভাষার প্রতি কোনো অসম্মান নেই।”

ভাষাবিদ ও রাজনীতিবিদরা বলছেন, প্রশাসনিক নথিতে এমন শব্দচয়ন যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি করতে পারে। একজন ভাষাবিদ বলেন:

“বাংলা একটি বহুজাতিক ভাষা। ভাষার উৎস দিয়ে পরিচয় নির্ধারণ করা উচিত নয়, বরং নির্দিষ্ট ভাষাটিকে স্বীকৃতি দিতে হবে তার নিজস্ব মর্যাদায়।”

এই বিতর্কে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে ভাষা ও পরিচয়ের রাজনীতি। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের আবহে বিষয়টি নতুন করে জাতীয় সংবেদনশীলতার আলোচনায় চলে এসেছে।

ভাষার প্রশ্নে ভারতীয় সমাজ যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিনই ‘বাংলা’ তার জায়গা ধরে রাখবে—এই বিশ্বাস নিয়েই রাজ্যের মানুষ এখন প্রতিবাদে সোচ্চার।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন