বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রতি ভারতের অবস্থানে লক্ষণীয় নরম ভাব এসেছে। দীর্ঘদিন অবিশ্বাস ও সন্দেহের দেয়ালে বন্দী থাকা ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে এখন বিএনপিকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে—এমন ইঙ্গিত মিলছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে।
২০০৪ সালের চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র আটক কাণ্ডের পর তারেক রহমান এবং বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক চরম অবিশ্বাসের পর্যায়ে পৌঁছায়। সেই তারেক রহমানই এখন ভারপ্রাপ্ত দলনেতা হিসেবে ভারতের কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। নয়াদিল্লির কর্মকর্তারা বলছেন, সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং বিএনপির কৌশলগত অবস্থান তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে বাধ্য করেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। শেখ হাসিনার সরকার কেন্দ্রিক কূটনীতিকে পুনর্মূল্যায়ন করে ভারত এখন অপেক্ষা করছে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে দিল্লি।
নয়াদিল্লির এক কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, “তারেক রহমান এখন অনেক বেশি পরিণত। তিনি যদি সরকারপ্রধান হন, তাহলে ভারত সফরের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোতে কোনো আপত্তি থাকবে না।”
গত বছর ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন, যা দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। বৈঠকের পর মির্জা ফখরুল ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই-কে বলেন, “ভারতকে আমরা আশ্বস্ত করেছি—বিএনপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের মাটি ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করতে পারবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকা ভারতকে উদ্বিগ্ন করলেও, এখন নয়াদিল্লি এই দলটিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে চাইছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, “ভারত বুঝতে পেরেছে—জামায়াত কখনোই তাদের পছন্দের শক্তি নয়। তারা বিএনপিকে কেন্দ্র করেই আগামীর কূটনৈতিক কৌশল সাজাচ্ছে।”
অবশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় কিছু প্রতিবন্ধকতাও দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার মন্তব্য ভারতকে অসন্তুষ্ট করেছে। বিশেষ করে বিজয় দিবসে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক পোস্ট ও বিডিআর কমিশনের প্রধানের উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য বিষয়গুলোকে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
বিএনপি বলছে, তারা ভারতকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তবে সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক স্বার্থ ও আত্মমর্যাদার সম্মান। “ভারতের উচিত সব ডিম এক ঝুড়িতে না রাখা। জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক গড়তে হবে,” বলেন মির্জা ফখরুল।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন সীমান্ত বাণিজ্য ও ভিসা প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যেই প্রভাব ফেলেছে। স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়েছে, আর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা কার্যত স্থগিত রয়েছে।
সাউথ এশিয়া মনিটরের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় শীতলতা দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক সংযোগকে ব্যাহত করছে। ইউনূস-মোদী বৈঠকও সম্পর্ক উষ্ণ করতে পারেনি। একমাত্র অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই এই অচলাবস্থা কাটাতে পারে।

