নওগাঁ প্লাস্টিকের দাপটে বিপাকে ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প, আয় সংকটে কারিগররা
প্লাস্টিকের সস্তা ও সহজলভ্য পণ্যের কারণে নওগাঁয় দিন দিন কমছে বাঁশ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্যের কদর। এতে করে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের কাজ ও আয় দুটোই কমে গেছে। জীবন-জীবিকা রক্ষায় তারা পড়েছেন চরম সংকটে। ক্ষুদ্র এই হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসময় গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি স্তরে বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। গৃহস্থালি, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বাঁশের তৈরি কুলা, চালনী, ডোল, ঝাঁপি, ঝাড়ু, দোলনা ও আসবাবপত্র ছিল অপরিহার্য। তবে সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক জীবনধারায় প্লাস্টিকের পণ্য জায়গা করে নেওয়ায় বাঁশ পণ্যের ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছে।
এদিকে বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফলে বাঁশ দিয়ে তৈরি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও প্লাস্টিকের সস্তা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না কারিগররা। এতে করে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি এই শিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ দাশপাড়া গ্রামে প্রায় ৪০টি পরিবারে ছোট-বড় মিলিয়ে বসবাস করছে প্রায় ২০০ জন। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ জনই বাঁশ পণ্য তৈরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এখানকার কারিগররা বাঁশ দিয়ে বাচ্চাদের দোলনা, কুলা, চালনী, পাখা ও বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরি করেন। তবে বাঁশের দাম বৃদ্ধি এবং বাজার সংকোচনের কারণে তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কাজ কমে যাওয়ার পরও সপ্তাহে এই পাড়া থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকার বাঁশ পণ্য উৎপাদন হচ্ছে।
বয়োজ্যেষ্ঠ কারিগর অতিন কুমার বলেন, “১০-১২ বছর বয়স থেকেই বাপ-দাদার কাছ থেকে বাঁশের কাজ শিখেছি। কয়েক বছর আগেও কাজের চাপ ছিল, আয়ও ভালো হতো। এখন প্লাস্টিকের কারণে আয় অনেক কমে গেছে। পুরো সপ্তাহ কাজ করে খরচ বাদ দিয়ে দেড় হাজার টাকাও থাকে না। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে।”
আরেক কারিগর অখিল দাস বলেন, “২৫ বছর ধরে এই কাজ করছি। পাঁচ বছর আগেও বাঁশ পণ্যের ভালো কদর ছিল। প্লাস্টিক আসার পর ধীরে ধীরে বাজার কমেছে। তবে কুলা, ঝাড়ু ও টোপার এখনো কিছুটা চাহিদা আছে। গত তিন বছরে প্রতিটি বাঁশের দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।”
কারিগর গৃহবধূ রত্না জানান, বছরে প্রায় ৯ মাস কাজ করা যায়। বর্ষাকালে তিন মাস কাজ বন্ধ থাকে, তখন ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। শীত মৌসুম ও বিভিন্ন মেলায় বাঁশ পণ্যের চাহিদা বাড়লে কাজের চাপও বাড়ে। পণ্যগুলো সাধারণত পাইকারিতে বিক্রি করা হয়।
গৌতম দাস বলেন, “এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। অন্য কাজ আমরা জানি না। মানুষ একদিন কাজ করে যেখানে ৫০০-৭০০ টাকা আয় করে, সেখানে আমরা পুরো সপ্তাহ কাজ করে দেড় হাজার টাকা পাই। এভাবে সংসার চালানো কঠিন। অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছে।”
মানিক চন্দ্র দাস বলেন, “আগে ৫০ টাকায় বাঁশ পাওয়া যেত, তখন পণ্যের দামও ভালো ছিল। এখন বাঁশের দাম বেড়েছে, কিন্তু পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে জীবিকা সংকটে পড়েছি। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা খুব জরুরি।”
এ বিষয়ে নওগাঁ বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক শামীম আক্তার মামুন বলেন, “সহজলভ্য হওয়ায় প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। তবে বাঁশ পণ্য পরিবেশবান্ধব। পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে আবারও এর ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। বিসিকের পক্ষ থেকে পণ্য বিপণন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং স্বল্পসুদে ঋণসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। নারীদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ও পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সম্ভাবনাময় শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।


